কিডনি রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার

কিডনি?

মানবদেহের ভাইটাল অর্গান গুলোর মধ্যে কিডনি অন্যতম। যেটার প্রয়োজনীয়তা মানবদেহে অনেক।পৃথিবীতে যত প্রাণঘাতী রোগে মানুষ মারা যাচ্ছে তার মধ্যে বর্তমানে কিডনি রোগ অন্যতম। কিডনি রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার সম্পর্কে তাই আজ জানবো।

মানবদেহের কোমরের কিছুটা উপরে দুই পাশে দুইটা কিডনি থাকে। পরিণত বয়সে একটি কিডনি ১১-১৩ সে.মি লম্বা, ৫-৬ সে.মি চওড়া এবং ৩ সে.মি পুরু হয়। তবে বাম কিডনি ডান কিডনি থেকে একটু  বড় ও কিছুটা উপরে থাকে। কিডনি মূলত নেফ্রন দিয়ে তৈরি।যার পরিমাণ প্রায় ২০-২৫ লক্ষাধিক। এই নেফ্রনই কিডনির কার্যকরী ও গাঠনিক একক। কোন কারনে এই নেফ্রনগুলো নষ্ট হয়ে গেলে কিডনি তার কার্যকারীতা হারায়।  

বর্তমান সময়গুলোতে কিডনি রোগীর সংখ্যা দিন দিন আশংকাজনক হারে বেড়ে চলেছে। কিডনি রোগের লক্ষণ গুলো সাধারণ মানুষজন শুরুতেই জানতে পারলে এবং সঠিক সময়ে চিকিৎসা শুরু করতে পারলে এই হার অনেকাংশেই কমে যেতে পারতো। উল্টো মানুষজন জানতে না পেরে, বুঝতে না পেরে এবং চিকিৎসা দেরিতে শুরু করবার কারণে কিডনি ফেইলরের শিকার হচ্ছে। ফলশ্রুতিতে গোটা বিশ্বে প্রতি বছর ৫-১০ মিলিয়ন মানুষ এই কিডনি রোগে মারা যাচ্ছে। শুধু বাংলাদেশেই প্রতি বছর ৪০ হাজারের অধিক রোগী কিডনি রোগে মারা যাচ্ছে।

একদম ছোট ভাবে কিডনির কাজ বললে বলতে হয়, কিডনি শরীরের রক্ত থেকে বর্জ্য ও বাড়তি পানি বের করে দেয়। কিডনি রোগে আক্রান্ত হলে বাড়তি পানি বের হতে পারে না এবং শরীর (যেমনঃ পা) ফুলে যায়।

কিডনি রোগ কেনো হয়?

কিছু রোগ আছে যেগুলো সরাসরি কিডনির ক্ষতি করে। আবার কিছু সিস্টেমিক রোগ আছে যেগুলো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ্যভাবে কিডনির ক্ষতি করে।ডায়াবেটিক্স ও উচ্চ রক্ত চাপ কিডনি রোগের সব থেকে বড় কারন। এর বাহিরেও এমন কিছু রোগ আছে যেগুলো কিডনি রোগের কারন।

বার বার প্রস্রাব ইনফেকশন হলে।

প্রস্টেট এর সাইজ বড় হয়ে গেলে।

বংশে কিডনি রোগী থাকলে।

কানেক্টিভ টিস্যু ডিসঅর্ডার হলে।

কিডনিতে বার বার পাথর হলে।

প্রেগনেন্সির সময় হাইড্রোনেফ্রোসিস হলে। হাইড্রোনেফ্রোসিস হয়েছে কিনা সেটা প্রেগনেন্সির সময় ডাক্তারের পরামর্শ অনুসারে আলট্রাসনোগ্রাফি করলে জানা যাবে।  

পানি কম খেলে।

প্রচুর ধূমপান করলে।  

অধিক মদ্য পান করলে।

কিডনি রোগের লক্ষন কি কি?

কিডনি রোগ যেকারোরই হতে পারে। কিডনি রোগের কারণে মৃত্যুও হতে পারে যেকারোরই! কিন্তু মানুষ যদি সচেতন হয় তবে আক্রান্ত এবং মৃত্যুর হার কমে আসতে পারে। আর তা আসতে পারে দুই ভাবে। ১। খাদ্যাভ্যাস এবং জীবন যাপনের ধরন পরিবর্তনের মাধ্যমে এবং ২। কিডনি রোগের লক্ষণ গুলো জানার মাধ্যমে।

আমরা প্রথমে কিডনি রোগের লক্ষণ গুলো জানবো। তারপর,  কিডনি কিভাবে ভালো রাখা যায় সেটা জানবো।  

প্রস্রাবে পরিবর্তন

প্রস্রাবে পরিবর্তন কিডনি রোগের একটা বড় লক্ষণ। কিডনি রোগে প্রস্রাব কম বা বেশী হতে পারে। বিশেষ করে রাতে এই সমস্যা বেশি হয়। প্রস্রাবের বেগ অনুভূত হবার পরও প্রস্রাব হচ্ছে না, এমনটাও হতে পারে।

প্রস্রাবের সময় ব্যাথা

কিডনি রোগে প্রস্রাবের সময় জ্বালা পোড়া বা ব্যাথা অনুভূত হতে পারে। প্রস্রাবের রং গাড় হয়ে যেতে পারে। এই সময় জ্বর ও পিঠের পিছনে ব্যাথা হতে পারে। প্রস্রাবের সময় রক্তও যেতে পারে।

বমি বমি ভাব

শরীর থেকে বর্জ্য পদার্থ বের না হতে পারায় রক্তে বর্জ্য পদার্থের পরিমাণ বেড়ে যায়। ফলে বমি বমি ভাব হতে পারে এবং বমিও হতে পারে।  

শরীরে ফোলা ভাব

শরীরের অতিরিক্ত পানি এবং বর্জ্য বের না হতে পারায় শরীর ফুলে যেতে পারে। সকালের দিকে চোখের পাতা, মুখ মণ্ডল ও পা ফোলা পাওয়া যেতে পারে। কিডনি রোগের লক্ষণ এর মধ্যে অস্বাভাবিক হারে শরীর ফুলে যাওয়া অন্যতম ।   

সব সময় শীত অনুভব করা

কিডনি রোগীদের গরমের মধ্যেও শীত শীত ভাব লাগতে পারে। ঘন ঘন জ্বর আসাটাও মোটেই অস্বাভাবিক নয়। এছারাও আরও কিছু লক্ষণ থাকতে পারে কিডনি রোগীদের। যেমনঃ খিদে কম পাওয়া, দুর্বল লাগা, মাথা ঘুরা , ভুলো মনা হওয়া, ত্বকে র্যাশ হওয়া, ঘুমের সমস্যা হওয়া।

প্রাথমিক অবস্থায় কিডনি রোগ ধরা পরলে তার অধিকাংশই নিরাময় হয়। আর এ জন্যেই কিডনি রোগের প্রাথমিক লক্ষণ গুলো জেনে রাখা জরুরি।

কিডনি ভাল রাখার উপায় কি?

মেডিকেল টার্মে একটা লাইন আছে “Prevention is better than cure” । প্রাথমিক পর্যায়ে  কিডনি রোগ ধরা পরলে ৩০ ভাগ রোগী নিরাময় হলেও ৬০ ভাগ রোগীর কিডনি অকেজো হয়ে যায় চিকিৎসার ১০-১৫ বছর পরেই! এটি সত্যিই ভয়ানক একটা ব্যাপার! তাই সর্বাবস্থায় সচেতন থাকাটাই মূল বিষয়। কিডনি রোগের লক্ষণ জানাটাই সব কিছু নয়!চর্বি জাতিয় খাবার ও লবণ কম খাওয়া।

পরিমিত পানি খাওয়া।

চিকিৎসকের পরামর্শ ব্যাতিত অ্যান্টিবায়োটিক ও তীব্র ব্যাথা নাশক ঔষধ সেবন না করা।

ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্ত চাপে আক্রান্ত রোগিদের কিডনির কার্যকারিতা প্রতি ৬ মাস অন্তর অন্তর পরীক্ষা করা।

উচ্চ রক্ত চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা।

ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা।

ঘন ঘন প্রস্রাবের ইনফেকশন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া।

ডায়রিয়া, বমি, ও রক্ত আমাশয়ের কারণে রক্ত পড়ে ও লবণশূন্য হয়ে কিডনি বিকল হতে পারে। তাই দ্রুত খাবার স্যালাইন খেতে হবে। এবং প্রয়োজনে স্যালাইন লাগাতে হবে। অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসারে।  

শিশুদের জ্বর, গলা ব্যাথা এবং খোস –পাঁচরা হলে ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়া।

ফাস্ট ফুড এড়িয়ে চলা।

ধূমপান ও মদ্যপান পুরোপুরি ছেড়ে দেয়া।

কি কি খাবার খেলে কিডনি ভালো থাকে?

পানি পান করা

ইউএসএ এর জাতীয় সাইন্স একাডেমীর বরাতে জানা যায় একজন প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষের দৈনিক ৩.৭ (১৩-১৪ গ্লাস) লিটার এবং প্রাপ্ত বয়স্ক নারীর দৈনিক ২.৭ (১০-১১ গ্লাস) লিটার পানি পান করা উচিত। আর পরিমাণ মতো পানি পান করার মাধ্যমে আপনি কিডনি রোগ থেকে অনেকটাই বেঁচে থাকতে পারবেন।

ফলমূল ও সবজি খাওয়া

দানা বা বীজ জাতীয় খাদ্য খান যেমন ব্রেড, নুডুলস, বাদাম ইত্যাদি। সপ্তাহে অন্তত একটি কচি ডাবের পানি পান করুন। প্রতিদিন অন্তত চারটি থানকুচি পাতা খেতে হবে। শশা, তরমুজ, লাউ, বাঙ্গি, কমলালেবু, লেবু, মাল্টা, ডালিম, বীট, গাজর, আখের রস, বার্লি, পিয়াজ, সাজনা ইত্যাদি পরিমাণ মতো খেতে হবে।

গোক্ষুর

গবেষণায় দেখা গেছে যাদের প্রসাবের পরিমাণ কমে যায় এবং হাত পায়ে পানি জমে তারা নিয়মিত গোক্ষুর চূর্ণ ৩ গ্রাম মাত্রায় সেবন করলে প্রস্রাবের পরিমাণ ঠিক হয়ে যায় এবং শরীরে জমে থাকা পানি বা ইউরিক এসিডের পরিমাণ কমিয়ে দেয়।

এছারাও রক্ত চন্দন, পাথরকুচি, জুনিপার বেরিস কিডনি ভালো রাখতে বেশ সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

কিডনি রোগের ফলে কি কি জটিলতা হতে পারে?

কিডনি রোগের জটিলতা বলে শেষ করা যাবে না। এটা যেমন অন্য রোগের কারণে হতে পারে, ঠিক তেমনি অন্য অনেক রোগও কিডনি রোগের কারণে হয়ে থাকে।  তার মধ্যে কিছু রোগের কথা না বললেই নয়!হঠাৎ করে রক্তে পটাশিয়ামের মাত্রা বেড়ে যাওয়া। রক্তে পটাশিয়ামের মাত্রা বেড়ে গেলে হার্টের কার্যক্ষমতা কমে যেতে পারে।

কার্ডিওভাস্কুলার ডিজিজ (হৃদপিণ্ড এবং রক্ত নালী জনিত রোগ)

হাড় নরম হয়ে যাওয়া। ফলে হাড় ভেঙ্গে যাবার সম্ভাবনা বহুগুনে বেড়ে যায়। এছাড়া হাড়ে ক্যালসিয়াম কমে যেতে পারে এবং ব্যাথাও হতে পারে।

হাত পায়ে পানি জমে যেতে পারে। শরীর থেকে বর্জ্য পদার্থ বের না হতে পারায় এ সমস্যা হয়।

কেন্দ্রীয় মস্তিস্কের ক্ষতি সাধন হতে পারে (Damage to the central nervous system)

রক্ত শূন্যতা (Anemia)

যৌন চাহিদা কমে যাওয়া।

কিডনি রোগের পরীক্ষা কি কি?

মাত্র দুইটি পরীক্ষার মাধ্যমে জানা যায় কিডনি রোগ হয়েছে কি হয়নি! একটি হল প্রস্রাবে অ্যাল্বুমিন বা মাইক্রোঅ্যাল্বুমিন এবং অন্যটি রক্তের ক্রিয়েটিনিন (Serum creatinin)। এছারাও ইউএসজি (USG) , কিডনির বায়োপ্সি ইত্যাদি করা হয়।

মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের ৯০ শতাংশ মানুষেরই কিডনি ডায়ালাইসিস করার সামর্থ্য নাই। তাই একটুখানি সচেতনতা এবং জানাশোনা আপনাকে এই রোগ থেকে মুক্তি দিতে পারে। তাই সতর্ক হউন, সতর্ক করুন!

3 thoughts on “কিডনি রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার”

Leave a Comment