নিউমোনিয়ার লক্ষণ কি কি এবং নিউমোনিয়া হলে করনীয় কি?

বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৫০ হাজার বাচ্চা নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। এবং পাশ্ববর্তি দেশ ভারতে এই সংখ্যা প্রায় আট লক্ষাধিক। অবশ্য বাংলাদেশে এখন শিশুদের সরকারিভাবে নিউমোনিয়ার টিকা দেওয়া হচ্ছে। নিউমোনিয়ার লক্ষণ কি কি তা জানার আগে আমরা জেনে নেবো নিউমোনিয়া কি  এবং নিউমোনিয়া কেন হয়।

নিউমোনিয়া কি

নিউমোনিয়া হল ফুসফুস ও শ্বাসযন্ত্রের প্রদাহজনিত রোগ। ফুসফুসে স্ট্রেপটোকক্কাস জাতীয় ব্যাকটেরিয়া কিংবা শ্বাসযন্ত্রের সিনসিশিয়াল ভাইরাস (আরএসভি) সংক্রমণ ঘটালে ফুসফুস ফুলে ওঠে, ভরে ওঠে পুঁজে বা তরল পদার্থে, যা অক্সিজেন গ্রহণ করে নিঃশ্বাস নেওয়ার ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। তখন ফুসফুসে প্রদাহ হয়। সাধারণত ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, ফাঙ্গাস এবং টিবি’র জীবাণুর মাধ্যমে নিউমোনিয়া রোগ হয়ে থাকে।

নিউমোনিয়া মৃদু বা হালকা এবং কখন কখনও জীবন হানিকরও হতে পারে। সাধারণত বয়স্ক ব্যক্তিদের, যারা দীর্ঘদিন রোগে ভুগছেন অথবা যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল বা কম তাদের মধ্যে নিউমোনিয়া বেশী দেখা যায়। তবে তরুণ, অল্প বয়স্ক, স্বাস্থ্যবান লোকদেরও নিউমোনিয়া হতে পারে। শীতকালে বাচ্চাদের মধ্যে নিউমোনিয়ার প্রাদুর্ভাব প্রচুর বেড়ে যায়।

এখন প্রশ্ন আসতে পারে শ্বাসযন্ত্রের যে প্রদাহ হয়েছে তা বুঝবো কিভাবে? যখন জ্বর এবং এর সঙ্গে কফ ও শ্বাসকষ্ট থাকে, তখনই কেবল শ্বাসতন্ত্রে প্রদাহ হয়েছে বলে ধরা হয়। তবে নিউমোনিয়া সঠিকভাবে নির্ণয়ের জন্যে অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হবে। এরপরও পাঠকের সচেতনতার জন্য নিউমোনিয়া হবার কারণ জানার পর নিউমোনিয়ার লক্ষণ গুলো সম্বন্ধে আমরা জানবো।

নিউমোনিয়া হবার কারণ

সাধারণত বেশীর ভাগ সময় ব্যাকটেরিয়ার কারণে নিউমোনিয়া হয়ে থাকে। পঁয়ষট্টি বছরের বেশী বয়স্কদের মধ্যে যারা অ্যাজমা অথবা হার্টের রোগে ভুগছেন তারাই ব্যাকটেরিয়াল নিউমোনিয়ায় বেশী আক্রান্ত হয়ে থাকে। এছাড়াও নিউমোনিয়া হবার আরও কিছু কারণ আছে যেগুলো এক নজরে দেখে নেয়া যাক।

ব্যাকটেরিয়া- নিউমোক্কাস,স্ট্যাফাইলোক্কাস ইত্যাদি
ছত্রাক-  মূলত যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম তাদের ছত্রাক দিয়ে হয়
ভাইরাস
হঠাৎ ঠান্ডায় উন্মুক্ত হওয়া
অপারেশনের পরর্বতী সময়
কেমিক্যালের কারণে।

নিউমোনিয়ার লক্ষণ

সিজোনাল জ্বরের মতোই হতে পারে নিউমোনিয়ার শুরুটা। তবে তা ধীরে ধীরে খারাপের দিকে চলে যেতে পারে। নিউমোনিয়ার লক্ষণ গুলোর মধ্যে অন্যতম হলো,

জ্বর
মাথা ব্যাথা
শ্বাসকষ্ট
কাশি
বুকে ব্যাথা
ক্ষুধা মন্দা
কাঁপুনি
মাংস পেশিতে ব্যাথা
ক্লান্তি অনুভব করা
ঘাম হওয়া
বমি বমি ভাব হওয়া
ডায়রিয়া হওয়া
ভুলো মনা হওয়া

শিশুর শ্বাসকষ্ট হচ্ছে কিনা

নিউমোনিয়ার লক্ষণ গুলো অবশ্যই আমাদের ধারণা দিবে যে আমাদের বাচ্চা নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে কিনা। তবে এর বাহিরে আরও কিছু জানবার আছে, তার মধ্যে অন্যতম হল শিশুর শ্বাসকষ্ট হচ্ছে কি হচ্ছে না। যেহেতু শিশুরা নিউমোনিয়ায় বেশী আক্রান্ত হয় সেহেতু আমাদের এই বিষয়টা সম্পর্কে জানা অতীব জরুরী।

শ্বাসযন্ত্রের প্রদাহ হয়েছে কিনা তা আমরা শুরুতেই জেনেছি। আর এখন আমরা জানবো আপনার শিশুর শ্বাস কষ্ট হচ্ছে কিনা। দুই মাসের নিচের শিশুর শ্বাস-প্রশ্বাসের হার মিনিটে ৬০ বারের বেশি, এক বছরের নিচে ৫০ বার বা তার বেশি এবং এক বছর থেকে পাঁচ বছরের শিশুর মিনিটে ৪০ বার তা তার বেশি শ্বাস-প্রশ্বাস হলে তাকে শ্বাসকষ্ট বলা হয়। তাই জ্বর-কাশিতে আক্রান্ত শিশু এ রকম ঘন ঘন শ্বাস নিলে বা শ্বাসের সঙ্গে বুক বা পাঁজর নিচে দেবে যেতে থাকলে সতর্ক হোন, হয়তো সে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে।

কাদের নিউমোনিয়া হবার সম্ভাবনা বেশী

সাধারণত শিশু এবং বয়স্কদের মধ্যে নিউমোনিয়া হবার সম্ভাবনা বেশী থাকে। তবে এর বাহিরেও সুস্থ সবল মানুষও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হতে পারে। যাদের নিউমোনিয়া হবার সম্ভাবনা বেশী তাদের একটা তালিকা নিচে তুলে ধরা হল।

পাঁচ বছরের কম শিশুদের
পঁয়ষট্টি বছরের বেশী বয়স্কদের
ধূমপায়ীদের
মদ সেবনকারীদের
বহুদিন ধরে ভুগছে এমন কোনো রোগ থাকলে। যেমন: ডায়াবেটিস, হৃদ্‌রোগ, ফুসফুসের অন্য কোনো রোগ, এইডস ইত্যাদি থাকলে
পুষ্টির অভাব থাকলে

নিউমোনিয়ার জটিলতা

নিউমোনিয়ার জটিলতা এতটাই বেশী যে প্রতি বছর প্রায় ৯ লক্ষ ২০ হাজার শিশু এবং বাচ্চা নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যায় । প্রধানত দক্ষিণ এশিয়া এবং সাহারা মরুভূমির দক্ষিণে অবস্থিত আফ্রিকা মহাদেশে নিউমোনিয়ার প্রাদুর্ভাব বেশি। নিউমোনিয়ার বেশ কিছু জটিলতা রয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হল-

তীব্র শ্বাস কষ্ট
রক্ত প্রবাহে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ
ফুসফুসের চারদিকে তরল পদার্থ জমা হওয়া।

নিউমোনিয়ার চিকিৎসা

সাধারণ নিউমোনিয়ার চিকিৎসা বাড়িতেই সম্ভব। এ জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসারে ওষুধের পাশাপাশি এ সময় প্রচুর তরল খাবার খেতে হবে এবং পুরোপুরি বিশ্রাম নিতে হবে। নিউমোনিয়া ভালো হতে দুই থেকে তিন সপ্তাহ লেগে যেতে পারে। এ সময় কুসুম গরম পানি, লবণ-পানি বা লাল চা দেওয়া যেতে পারে।

আর শিশুদের ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, দুই বছরের নিচের শিশুদের বুকের দুধ খাওয়ানো বন্ধ করা যাবে না। বুকে তেল দেয়া, কোনো বাম ব্যবহার করা ইত্যাদি উচিত হবে না। শিশুদের সামান্য কাশিতে অহেতুক সাকশন যন্ত্র দিয়ে কফ পরিষ্কার বা নেবুলাইজার যন্ত্র ব্যবহারও ঠিক হবে না। যদিও তা প্রয়োজন হয় তবে তা অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবহার করতে হবে।

নিউমোনিয়ায় কখন হসপিটালে যাবেন

যদিও নিউমোনিয়ার চিকিৎসা বেশিরভাগ সময় বাসাতেই সম্ভব তারপরও কিছু কিছু সময় হসপিটালে ভর্তি হবার মতো অবস্থা তৈরি হতে পারে। খুব বেশী শ্বাসকষ্ট হলে, বুকে প্রচণ্ড ব্যাথা কিংবা চাপ অনুভূত হলে, কাশির সাথে রক্ত আসলে, রোগী অজ্ঞান হয়ে গেলে, প্রচণ্ড বমি হলে, খিঁচুনি থাকলে, এবং জ্বরের তাপমাত্রা ১০১ ডিগ্রি সেলসিয়াস এর উপরে গেলে রোগীকে অবশ্যই দ্রুততার সাথে হসপিটালে নিতে হবে।

নিউমোনিয়া প্রতিরোধের উপায়

সচেনতাই নিউমোনিয়া প্রতিরোধের অন্যতম মাধ্যম। প্রথমত নিউমোনিয়া থেকে বাঁচার পথ জানতে হবে এবং দ্বিতীয়ত নিউমোনিয়া হয়ে গেলে সতর্কতার সাথে নিয়ম মেনে চলতে হবে। তাই বলাই যায়, নিউমোনিয়া প্রতিরোধ যোগ্য।

নিউমোনিয়ার ভ্যাক্সিন দিতে হবে।
ভালোভাবে পরিষ্কার করে হাত ধুতে হবে। যেমনঃ বাথরুম থেকে আসার পর, খাবার আগে ও পড়ে।
ধূমপান করা বন্ধ করে দিতে হবে।
শিশুকে চুলার ধোঁয়া, মশার কয়েল ও সিগারেটের ধোঁয়া থেকে দূরে রাখতে হবে।
শিশু জন্মের পর ইপিআই শিডিউলের ভ্যাকসিনগুলো নিশ্চিত করতে হবে।
সুষম খাদ্য গ্রহণ করতে হবে
সাধারণ ঠাণ্ডা লাগা থেকে নিজেকে হেফাজতে রাখার চেষ্টা করতে হবে।
অন্যের সামনে হাঁচি/কাশি দেয়া থেকে যথাসম্ভব বিরত থাকতে হবে। হাঁচি/কাশি দেয়ার সময় অবশ্যই মুখ হাত দিয়ে ঢাকতে হবে বা রুমাল ব্যবহার করতে হবে।

এছাড়াও যাঁরা রাতে বিভিন্ন খেলাধুলা করে, বিশেষ করে যাঁরা রাতে ব্যাডমিন্টন খেলেন, তাঁদের একটু সচেতন হওয়া উচিত। কারণ, গাঁ ঘেমে তা যদি আবার শরীরে শুকিয়ে যায় তাহলে তা থেকে সাধারণত ঠান্ডা, সর্দি-কাশি হতে পারে। সেখান থেকে নিউমোনিয়া হয়ে যেতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *