২০২০ এর ফেব্রুয়ারি থেকে আমরা করোনা ভাইরাস সম্পর্কে জানলেও বিশ্বের বুকে এটাই প্রথম কোন ভাইরাস নয়। গত কয়েক শতাব্দীতে যত প্রাণঘাতী ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঘটেছিলো তাদের মধ্যে করোনা ভাইরাসের কারণে মৃত্যু হার এখন পর্যন্ত তুলনামূলক কমই বলা যায়। তারপরও গোটা বিশ্ব করোনা জ্বরে আক্রান্ত হয়ে আছে বেশ ভালো ভাবেই। মিডিয়ার ব্যাপক প্রচারণার ফলে মানুষ যেমন একদিকে করোনার ভয়ে আক্রান্ত হয়েছে তেমনি অন্যদিকে ব্যাপক সচেতনতা তৈরি হবার কারণে মৃত্যু হারও তুলনামূলক কমেছে অনেক।

সাম্প্রতিক দিন গুলোতে বিশ্বে অনেক ধরণের ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব হয়েছে, যেগুলোর দ্বারা মানুষজন প্রতিনিয়ত আক্রান্ত হচ্ছে এবং মারা যাচ্ছে। এই প্রাণঘাতী ভাইরাস গুলো মানবদেহের জন্য সত্যিই অনেক বড় হুমকি। নিচে বিশ্বের ১০ প্রাণঘাতী ভাইরাস এর একটা তালিকা তুলে ধরা হল।

মারবার্গ

বিজ্ঞানীরা ১৯৬৭ সালে মারবার্গ ভাইরাস শনাক্ত করেন। মারবার্গ ভাইরাস অনেকটা ইবোলার মতোই। উভয় রোগে আক্রান্ত রোগীর প্রচণ্ড জ্বর এবং সাথে শরীরের অভ্যন্তরে রক্ত ক্ষরণ হয়ে থাকে। ফলে রোগী শকে চলে গিয়ে মারা গিয়ে থাকে।

ইবোলা

১৯৭৬ সালে প্রথম সুদান এবং কঙ্গোয় মানুষের মধ্যে ইবোলা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঘটে। ইবোলায় আক্রান্ত রোগীর সাথে ঘনিষ্ঠ ভাবে মিশলে এই রোগে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। সাধারণত রোগীর প্রস্রাব, ঘাম, থুথু, হাঁচি, কাশি, বমি, বুকের দুধ কিংবা রোগীর সাথে শারীরিক সম্পর্কের মাধ্যমে এই রোগ ছড়ায়। এছাড়াও রোগীর রক্ত কোন সুস্থ ব্যাক্তির শরীরে কোন ভাবে প্রবেশ করলে এই রোগ হয়ে থাকে।

রেবিজ

রেবিজ ভাইরাস এক ধরনের নিউরোট্রফিক ভাইরাস যা মানুষ ও প্রাণীর দেহে রেবিজ রোগ তৈরি করতে পারে। এ রোগ সাধারণত প্রাণী ও মানুষের লালা রসের মাধ্যমে ছড়াতে পারে। এটি জলাতঙ্ক রোগের জন্য দায়ী। এটি একটি ভয়ানক রোগ হলেও বর্তমান বিশ্বে এই রোগের প্রাদুর্ভাব অনেকটাই কমে এসেছে। এটি সরাসরি মস্তিষ্কে আক্রমণ করে এবং মস্তিষ্কের প্রদাহ ঘটায়। যদি কেউ কোন প্রাণীর কামড়ে এই রোগে আক্রান্ত হয় এবং সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা না নেয় তবে রোগী নিশ্চিত মারা যাবে। তবে ১৯২০ সালে আবিষ্কৃত রেবিজ ভ্যাক্সিন সেই সম্ভাবনাকে প্রায় শতভাগ কমিয়ে নিয়ে এসেছে।

এইচ আইভি

বিশ্বের ১০ প্রাণঘাতী ভাইরাস এর মধ্যে এইচ আইভি অন্যতম। আধুনিক বিশ্বে সবথেকে প্রাণঘাতী ভাইরাস গুলোর মধ্যে সম্ভবত এইচ আইভি’ই সবার আগে থাকবে। ১৯৮০ এর আগ পর্যন্ত এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে বিশ্বব্যাপী প্রায় ৩২ মিলিয়ন মানুষ মারা যায়। মূলত এইডস কোন রোগ নয়, এটি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার অভাব জনিত ক্যান্সারসহ নানা সুযোগ সন্ধানী রোগের সমাহার।

গুটি বসন্ত

ওয়ার্ল্ড হেলথ এসেম্বলি ১৯৮০ সালে বিশ্বকে গুটি বসন্ত মুক্ত বলে ঘোষণা করেছে। কিন্ত তার আগে হাজার বছর ধরে গোটা বিশ্ব এই রোগে ভুগেছে, মারা গিয়েছে প্রতি তিন জনে একজন। ভাগ্যক্রমে যারা বেঁচে যেত তাদের শরীরে থেকে যেতো এককালীন ক্ষত। সাধারণত গুটি বসন্তে আক্রান্ত রোগীর জ্বর, শরীরে লালচে ভাব, প্রচুর গুটি ও ফুস্কুড়ি দেখা যায়।

আরো পড়ুনঃ বিশ্বের বেশীর ভাগ মৃত্যুর ১০ কারণ

হান্টা

হান্টা ভাইরাস মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায় না, ছড়ায় আক্রান্ত ইঁদুরের লালা থেকে। ১৯৫০ সালের কোরিয়ান যুদ্ধের সময় এই ভাইরাস প্রথম শনাক্ত হয়। ক্লিনিক্যাল জার্নাল ২০১০ এর তথ্য মতে ঐ যুদ্ধে ৩০০০ সৈনিক আক্রান্ত হয় এবং আক্রান্ত সৈনিকের ১২% মারা যায়। বলাই যায়, এই ভাইরাস একটা বায়োলজিক্যাল ওয়েপন ছিলো।

ইনফুয়েঞ্জা

WHO এর তথ্য মতে একটা সাধারণ জ্বরের সিজনে গোটা বিশ্বব্যাপী মারা যায় প্রায় পাঁচ লক্ষাধিক মানুষ। কিন্তু কখনো কোন নতুন প্রজাতির জ্বরের আবির্ভাব ঘটলে আক্রান্ত এবং মৃত্যুর হার দ্রুততার সাথে বাড়তে থাকে। ১৯১৮ সালের স্প্যানিশ ফ্লু এর মধ্যে অন্যতম। বিশ্বের প্রায় ৫০ মিলিয়ন মানুষ স্প্যানিশ ফ্লুতে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়।

ডেঙ্গু

১৯৫০ সালের দিকে ফিলিপাইন এবং থাইল্যান্ডে প্রথম ডেঙ্গু ভাইরাস ধরা পড়ে। বিশ্বের প্রায় ৪০% জনবসতির মধ্যে ডেঙ্গু রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। এটির প্রধান বাহক হল মশা। WHO এর তথ্য মতে প্রতি বছর বিশ্বের প্রায় ৫০-১০০ মিলিয়ন মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ হয়।

রোটা

রোটা ভাইরাস থেকে বাচ্চাদের সুরুক্ষায় বর্তমানে দুই ধরনের ভ্যাক্সিন পাওয়া যায়। বাচ্চাদের মধ্যে তীব্র ডায়রিয়া হবার অন্যতম বড় কারণ হল রোটা ভাইরাস। উন্নত বিশ্বে এই রোগের কারণে মৃত্যুর হার কম হলেই উন্নয়নশীল দেশ গুলোতে এই রোগের কারণে মৃত্যুর হার অনেক বেশী।

সার্স কোভিড ১ ও ২

WHO এর তথ্য মতে ২০০২ সালে প্রথম সার্স ভাইরাস ধরা পড়ে চীনের গুয়াংদং প্রদেশে। চীনে সার্স ভাইরাসের তীব্রতা বাড়ার সাথে সাথে বিশ্বের ২৬ টা দেশে এটি ছড়িয়ে পড়ে। বিশ্বের আট হাজারের বেশী মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হয়ে সাতশ এর অধিক মানুষ মারা যায়।
এছাড়া সার্স কোভিড ২ সার্স ভাইরাসেরই একটা বড় প্রজাতি, যেটা চীনের উহান প্রদেশে ২০১৯ এর ডিসেম্বরে ধরা পড়ে। মিডিয়ায় ফলাও ভাবে প্রচারিত হয় ২০২০ এর ফেব্রুয়ারি থেকে। ধারণা করা হয় যে এটি বাদুর থেকে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। বর্তমান বিশ্বের ১০ প্রাণঘাতী ভাইরাস এর মধ্যে ঘটমান রোগ এটি।


সোর্সঃ
১) LiveScience
২) Docmode
৩) Forumdaily
৪) Wiki