বিশ্বের বেশীর ভাগ মৃত্যুর ১০ কারণ

বিশ্বের বেশীর ভাগ মৃত্যুর ১০ কারণ সম্বন্ধে ভাবতে গেলে আমাদের মাথায় কি আসতে পারে? সার্স, মার্স অথবা করোনার মতো মহামারীর নাম? প্রতি একশ বছরে একটি করে মহামারী এসেছে আর বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ তাতে আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছে! অথচ জানেন কি, আমাদের এই হিসাবটা পুরোটাই ভুল!দৈনন্দিন জীবনে আমাদের আশেপাশের মানুষগুলো যেসব রোগে মারা যাচ্ছেন সেগুলোর মধ্যেই রয়েছে সেই রোগগুলো যেগুলোর কারণে বিশ্বের বেশীর ভাগ মানুষ মারা যাচ্ছে। ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন (WHO) এর তথ্য মতে ২০১৬ সালে বিশ্বে ৫৬.৯ মিলিয়ন মানুষ মারা গিয়েছে, যার মধ্যে অর্ধেকেরও বেশী (৫৪%) মানুষ মারা গিয়েছে এই ১০ কারণে। ওয়ার্ল্ড হেলথ অরগানিজেশন (WHO) এর ২০১৬’র তথ্য অনুসারে নিচে বিশ্বের বেশীর ভাগ মৃত্যুর ১০ কারণ তুলে ধরা হল।

বিশ্বের বেশীর ভাগ মৃত্যুর ১০ কারণে “ইস্কেমিক হার্ট ডিজিজ (IHD)”

বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতী রোগ গুলোর মধ্যে প্রথমেই রয়েছে করোনারি আর্টারি ডিজিজ (CAD) অথবা ইস্কেমিক হার্ট ডিজিজ (IHD)। ২০০০ সালে এই রোগের কারণে ৬ মিলিয়ন মানুষ মারা গেলেও ২০১৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮.৮ মিলিয়নে। বিশ্বের ১৫.৫% মৃত্যুর জন্যই দায়ী ইস্কেমিক হার্ট ডিজিজ (IHD) ।

বিশ্বের বেশীর ভাগ মৃত্যুর ১০ কারণ

ইস্কেমিক হার্ট ডিজিজ (IHD) তখনই হয় যখন রক্ত সরবরাহকারী রক্তনালী কারনবশত চিকন হয়ে যায়।  ইস্কেমিক হার্ট ডিজিজ (IHD) হলে বুকে ব্যাথা, হার্ট ফেইলর অথবা অ্যারিথমিয়া (Arrhythmias) হতে পারে। উন্নত বিশ্বে এর কারণে মৃত্যুর হাড় কমলেও উন্নয়নশীল দেশ গুলোতে দিনকে দিন তা বাড়ছে। উচ্চ রক্ত চাপ হলে, শরীরে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেড়ে গেলে, সিগারেটের নেশা থাকলে, ডায়াবেটিকস হলে এবং শরীরের ওজন স্বাভাবিকের থেকে বেশী হলে এই রোগ হবার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

বিশ্বের বেশীর ভাগ মৃত্যুর ১০ কারণে “স্ট্রোক”

২০১৬ সালে বিশ্বের ৬.২ মিলিয়ন মানুষ মারা যায় স্ট্রোক করে, যা বিশ্বের মোট মৃত্যুর ১১.১%। সাধারণত ব্রেইনে রক্ত সঞ্চালনে বাধাগ্রস্থ হলে কিংবা  রক্ত সঞ্চালনের পরিমাণ কমে গেলে স্ট্রোক হয়। সঠিক সময়ে চিকিৎসা না করা হলে স্ট্রোকের রোগী দীর্ঘ মেয়াদী পঙ্গুত্ব বরণ করতে পারে। প্রকৃতপক্ষে স্ট্রোকের কারনেই বেশীর ভাগ মানুষ দীর্ঘ মেয়াদী পঙ্গুত্ব বরণ করে থাকে। যদি একজন রোগী স্ট্রোক করার ৩ ঘন্টার মধ্যে চিকিৎসা নিতে ব্যর্থ হোন তবে তিনি দীর্ঘ মেয়াদী পঙ্গুত্ব বরণ করতে পারেন।

বিশ্বের বেশীর ভাগ মৃত্যুর ১০ কারণ

সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল এন্ড প্রিভেনশন (CDC) এর তথ্য মতে ৯৩% মানুষ শরীরের এক পাশ হঠাৎ করে অবশ অবশ ভাব অনুভব করেন, যেটা স্ট্রোকের লক্ষণ গুলার মধ্যে অন্যতম। যদিও তাতে রোগী বা রোগীর আশেপাশের মানুষ রোগের ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারে না। ফলে রোগীর চিকিৎসা বিলম্বিত হয়ে থাকে। আর মাত্র ৩৮% মানুষের মধ্যে স্ট্রোকের সব গুলো লক্ষণ দেখা যায়, যা স্ট্রোক হবার নিশ্চিত লক্ষণ বলে ধরা হয়। ইস্কেমিক হার্ট ডিজিজ (IHD) এর মতোই উচ্চ রক্তচাপ, শরীরে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেড়ে যাওয়া, সিগারেটের নেশা থাকা, ডায়াবেটিকস হওয়া এবং শরীরের ওজন স্বাভাবিকের থেকে বেশী হওয়া এই রোগ হবার অন্যতম কারণ।

ক্রনিক অবস্ট্রাক্টিভ পালমোনারি ডিজিজ (COPD)

ক্রনিক অবস্ট্রাক্টিভ পালমোনারি ডিজিজ (COPD) হল দীর্ঘ মেয়াদী এবং ঘটমান ফুসফুসের প্রদাহ জনিত রোগ। শ্বাসকষ্ট, থুথু এবং মিউকাস প্রোডাকশন এই রোগের অন্যতম লক্ষণ। ২০১৬ সালে এই রোগের কারণে বিশ্বে ৩ মিলিয়ন মানুষ মারা যায়, যা বিশ্বের মোট মৃত্যুর ৫.৫% । সিগারেটের নেশা করা কিংবা নেশা খোরের সঙ্গে চলা, কেমিক্যাল, পারিবারিক যোগসূত্র ইত্যাদি এই রোগ হবার অন্যতম কারণ।

বিশ্বের বেশীর ভাগ মৃত্যুর ১০ কারণ

আসলে এই রোগের উল্ল্যেখ যোগ্য কোন চিকিৎসা এখনও তেমন নেই তবে ওষুধ খাওয়ার মাধ্যমে এই রোগকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। তবে COPD থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হলো সিগারেটের নেশা থাকলে তা ছেড়ে দেওয়া।

লোয়ার রেস্পিরাটরি ইনফেকশন

লোয়ার রেস্পিরাটরি ইনফেকশন হল শ্বাসনালী এবং ফুসফুসের ইনফেকশন জনিত রোগ। ইনফ্লুয়েঞ্জা, নিউমোনিয়া, ব্রংকাইটিস এবং যক্ষ্মার কারণে শ্বাসনালী ও ফুসফুসের ইনফেকশন হতে পারে। ২০১৬ সালে ৩ মিলিয়ন মানুষ এই ইনফেকশন জনিত রোগের কারণে মারা যায়। যা বিশ্বের মোট মৃত্যুর ৫.৭%।

বিশ্বের বেশীর ভাগ মৃত্যুর ১০ কারণ
বিশ্বের বেশীর ভাগ মৃত্যুর ১০ কারণ

সাধারণত ভাইরাসের কারণে লোয়ার রেস্পিরাটরি ইনফেকশন হয়ে থাকে। ব্যাকটেরিয়ার কারনেও লোয়ার রেস্পিরাটরি ইনফেকশন হতে পারে। সঠিক চিকিৎসা না করালে রোগী শ্বাস নিতে ব্যর্থ হতে পারে এবং ফলশ্রুতিতে রোগী মারাও যেতে পারে।

অ্যালঝেইমার ডিজিজ অথবা ডিমেন্সিয়া

বিশ্বের বেশীর ভাগ মৃত্যুর ১০ কারণ

২০১৬ সালে এই রোগে বিশ্বের প্রায় ২ মিলিয়ন মানুষ মারা যায়, যা বিশ্বের মোট মৃত্যুর প্রায় ২.৮% । সাধারণত নারীরা এই রোগে বেশী আক্রান্ত হয়ে থাকে। এছাড়া ৬৫ বছরের বেশী বয়স হলে, বংশে এই রোগ থাকলে, ডাউন সিন্ড্রোম হলে এবং অস্বাস্থ্যকর জীবন যাপন করলে এই রোগ হবার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

আরো পড়ুনঃ বিশ্বের ১০ প্রাণঘাতী ভাইরাস 

ট্রাকিয়া, ব্রঙ্কাস, ফুসফুস ক্যান্সার

বিশ্বের বেশীর ভাগ মৃত্যুর ১০ কারণ

সাধারণত পরিবেশ দূষণ, সিগারেটের নেশা কিংবা নেশা খোরের সাথে নিয়মিত চলা ফেরা করলে ফুসফুসের ক্যান্সার হবার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। ২০১৬ সালে WHO এর রিসার্চে দেখা যায়, বিশ্বে ১.৭ মিলিয়ন মানুষ ফুসফুস ক্যান্সারে মারা যায় যা বিশ্বের মোট মৃত্যুর ৩% ।

ডায়াবেটিকস

সাধারণত ইনসুলিনের উৎপন্ন এবং ব্যবহারে অসংগতি হলে ডায়াবেটিকস হয়। ডায়াবেটিকস দুই ধরনের রয়েছে। ক) টাইপ ১ ডায়াবেটিকস এবং খ) টাইপ ২ ডায়াবেটিকস। টাইপ ১ ডায়াবেটিকস এ প্যানক্রিয়াস ইনসুলিন উৎপন্ন করতে পারে না। আর টাইপ ২ ডায়াবেটিকস এ প্যানক্রিয়াস যথেষ্ঠ পরিমাণ ইনসুলিন উৎপন্ন অথবা সঠিক ভাবে ব্যবহার করতে পারে না।

বিশ্বের বেশীর ভাগ মৃত্যুর ১০ কারণ

WHO এর তথ্য মতে ২০১৬ সালে বিশ্বে ১.৬ মিলিয়ন মানুষ ডায়াবেটিকস রোগে মারা যায়, যা বিশ্বের মোট মৃত্যুর ২.৮% । উচ্চ রক্তচাপ, শরীরের ওজন অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়া, নিয়মিত ব্যায়াম না করা, অসাস্থ্যকর জীবন যাপন করা ডায়াবেটিকস হবার মূল কারণ।

সড়ক দুর্ঘটনা অথবা রোড এক্সিডেন্ট

বিশ্বের বেশীর ভাগ মৃত্যুর ১০ কারণ

প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী প্রায় ১.৪ মিলিয়ন মানুষ শুধুমাত্র সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায় এবং দৈনিক তার সংখ্যা প্রায় ৩৭০০। যার তিন ভাগের দুই ভাগই পুরুষ।

ডায়রিয়া

সাধারণত ইনটেস্টিনাল ভাইরাস অথবা ব্যাকটেরিয়ার কারণে ডায়রিয়া হয়ে থাকে। যদি একটানা কয়েকদিন ধরে ডায়রিয়া চলতে থাকে তবে শরীর থেকে প্রচুর পরিমাণে পানি এবং লবণ বের হয়ে যায় এবং এই কারণে রোগী বিছানায় পড়ে যেতে পারে। সঠিক সময়ে রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি না করাতে পারলে রোগী মারাও যেতে পারে।

বিশ্বের বেশীর ভাগ মৃত্যুর ১০ কারণ

২০১৬ সালে গোটা বিশ্ব ব্যাপী ১.৪ মিলিয়ন মানুষ মারা যায়। বাচ্চাদের মধ্যে ডায়রিয়া দ্বিতীয় সর্বচ্চ মৃত্যুর কারণ। এবং প্রতি বছর প্রায় সাড়ে সাত লক্ষ বাচ্চা ডায়রিয়ার কারণে মারা যায়।

যক্ষ্মা

বিশ্বের বেশীর ভাগ মৃত্যুর ১০ কারণ

WHO এর তথ্য মতে ২০১৬ সালে বিশ্বের প্রায় ১.৩ মিলিয়ন মানুষ যক্ষ্মা রোগে মারা যায় যা বিশ্বের মোট মৃত্যুর ২.৪% । মায়োব্যাক্টেরিয়াম টিউবারকুলাসিস ব্যাকটেরিয়ার কারণে যক্ষ্মা রোগ হয়ে থাকে। BCG ভ্যাক্সিন যক্ষ্মার সব থেকে ভালো প্রতিষেধক।

 

সোর্সঃ

১) WHO

2) MDLINX

3) HealthLine

4) CDC

One thought on “বিশ্বের বেশীর ভাগ মৃত্যুর ১০ কারণ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *