দীর্ঘদিন ধরে জ্ঞানীয় কার্যের গুরুত্বপূর্ণ দিক যেমন মনোযোগ, শেখা এবং স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধির উপায় হিসেবে নিয়মিত ব্যায়াম বা অনুশীলন বেশ পরিচিত। এটি স্বাস্থ্যকর বয়স্কদের মধ্যে আলঝেইমার রোগের ঝুঁকিও হ্রাস করে।

কোন কিছু শেখার জন্যে এবং স্মৃতি শক্তির জন্যে মস্তিষ্কের হিপ্পোক্যাম্পাসকে দায়ী বলে বিবেচনা করা হয়। হিপ্পোক্যাম্পাস মিডিয়াল টেম্পোরাল লোবে (MTL) অবস্থিত এবং এটি মস্তিষ্কের ক্রিয়াকলাপের একটি সু-সংযুক্ত হাব যা ব্যায়ামের প্রভাবগুলির জন্য বিশেষভাবে সংবেদনশীল। আলঝাইমার রোগকে প্রায়শই মস্তিষ্কে সংযোগ বিচ্ছিন্নতার সিনড্রোম হিসাবে বর্ণনা করা হয়। ব্যায়ামের করার ফলে মিডিয়াল টেম্পোরাল লোব (MTL) এর সাথে স্নায়ু সংযোগের প্রভাবগুলি মূল্যায়ন করতে সুস্থ বয়স্কদের উপর একটি গবেষণা চালিয়েছে একদল গবেষক। চলুন জেনে নেয়া যাক সেই গবেষণা সম্পর্কে।

স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধির উপায়
স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধির উপায়

কারা কারা এই গবেষণায় অংশগ্রহণ করেছিলো?

গবেষণায় ৩৪ জন আফ্রিকান আমেরিকান প্রাপ্তবয়স্কদের একটি গ্রুপ অংশগ্রহণ করেছিল। যাদের সকলের বয়স ছিল ৫৫ বছরের বেশী। এবং যারা লাঠি ও হুইলচেয়ার ছাড়া নিরাপদে অনুশীলন বা ব্যায়ামে অংশ নিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে ছিল তিনজন পুরুষ এবং ৩১ জন মহিলা। তাদের গড় বয়স ছিল ৬৫ বছর। বেশী বয়সের কারণে তাদের গির্জা, সিনিয়র সেন্টার এবং সরকারী দফতর সহ নিউইয়র্ক, নিউ জার্সির আশেপাশের বিভিন্ন কমিউনিটি সাইটগুলিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। যেসব অংশগ্রহণকারীদের জ্ঞানীয় দুর্বলতা বা ডিমেনশিয়া ছিল এবং যারা এমন কোনও ওষুধ গ্রহণ করত যা তাদের জ্ঞানকে প্রভাবিত করতে পারে এমন অংশগ্রহণকারীদের গবেষণা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল।

গবেষণায় কি করেছিলো?

এই গবেষণাটি কোভিড-১৯ মহামারীর আগে হয়েছিল, যখন গ্রুপ অনুশীলন প্রোগ্রামে অংশ নেওয়া বেশ নিরাপদ ছিল। প্রাথমিক স্বাস্থ্য, ফিটনেস এবং জ্ঞানীয় মূল্যায়নের পরে ২০ সপ্তাহের নৃত্য-ভিত্তিক এ্যারোবিক অনুশীলন প্রোগ্রামে অংশ নেওয়া ৩৪ জন অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ১৭ জন প্রতি সেশনে ৬০ মিনিটের জন্য সপ্তাহে দু’বার মিলিত হয়েছিল। এই অনুশীলন প্রোগ্রামের নেতৃত্বে ছিলো একজন পেশাদার প্রশিক্ষক। সেই সেশনগুলোতে অংশগ্রহণকারীদের মাঝারি তীব্রতায় ব্যায়াম করানো হয় এবং সেই সময় তাদের হার্ট গুরুত্বের সাথে মনিটরিং করা হয় ।

গবেষণায় যারা সপ্তাহব্যাপী অনুশীলন করেছিলো এবং যারা করেনি তাদের মধ্যে তুলনা মূলক পর্যালোচনা করা হয়। ২০ সপ্তাহের ব্যায়ামের পর মিডিয়াল টেম্পোরাল লোব (MTL) এর সাথে স্নায়ু সংযোগের নমনীয়তার কোন প্রমান পাওয়া যায় কিনা তা খুঁজে দেখেছেন গবেষকরা। এটি দেখতে তারা ফাংশনাল চৌম্বকীয় অনুরণন ইমেজিং (এফএমআরআই) ব্যবহার করেছিলেন। তারা অংশগ্রহণকারীদের উপর শেখার এবং মেমরির পরীক্ষাও করে, এবং ফিটনেস, বডি মাস ইনডেক্স (বিএমআই) এবং স্বাস্থ্য সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহ করে।

গবেষণায় কি পাওয়া গিয়েছিলো?

গবেষকরা দেখেছেন যে যারা ব্যায়াম করেছিল তাদের মস্তিস্ক স্নায়ু সংযোগগুলি পুনরায় সাজানোর এবং পুনর্গঠন করার বৃহত্তর ক্ষমতা অর্জন করে। এর ফলে তারা আরও ভালভাবে শিখতে এবং তা ধরে রাখতে সক্ষম হয় যা একটি নতুন পরিস্থিতিতে সুন্দর ভাবে প্রয়োগ করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

যারা সেশনে অনশগ্রহন করেনি তাদের বডি মাস ইনডেক্স (বিএমআই), শারীরিক স্বাস্থ্য বা বায়বীয় ফিটনেসের কোনও উন্নতি হয়নি।এবং শেখার বা স্মৃতিশক্তির স্বাধীন ব্যবস্থাগুলিও উন্নত হয়নি। তবে এই সেশনে অংশগ্রহণকারীরা অতীতে শেখা তথ্যগুলি প্রয়োগ এবং পুনরায় সংযুক্ত করার দক্ষতায় উন্নতি দেখিয়েছিল। উদাহরণস্বরূপ, তারা পূর্ববর্তী জানা শোনার উপর ভিত্তি করে মাছ এবং শিশুর মতো স্পষ্ট পৃথক জিনিসের মধ্যে পার্থক্য করতে সক্ষম হয়েছিল।

এছাড়া, সাধারণীকরণ ভাবে যে কোন কিছু মিলানোর ক্ষমতা, একীভূত করার ক্ষমতা, এবং জ্ঞান পুনরুদ্ধার করার যে সক্ষমতা রয়েছে তা আনুপাতিক ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল।

উপরে বর্ণিত স্নায়বিক (কাঠামোগত) এবং জ্ঞানীয় (ক্রিয়ামূলক) উন্নতিগুলি শুধুমাত্র অনুশীলনে অনশগ্রহনকারি গ্রুপে দেখা গেছে। বাকিদের মধ্যে দেখা যায়নি।

এই গবেষণা ব্যায়াম এবং মস্তিষ্ক সম্পর্কে কি কি জ্ঞান প্রদান করে?

এই গবেষণার মাধ্যমে আমরা জানতে পারি যে, কি কি ব্যায়াম মিডিয়াল টেম্পোরাল লোব (MTL) এর উপর ইতিবাচকভাবে প্রভাব বিস্তার করতে পারে এবং জ্ঞানীয় কার্যক্রমে উন্নতি সাধন করতে পারে।

স্নায়ুবিজ্ঞানের এই সীমানা বয়সের সাথে সম্পর্কিত জ্ঞানীয় অবক্ষয়ের উন্নতির দিকে লক্ষ্য রেখে বিভিন্ন হস্তক্ষেপ – যেমন ব্যায়াম এর প্রক্রিয়া এবং কার্যকারিতা সম্পর্কে অন্তর্দৃষ্টি সরবরাহ করে।

এছাড়া গবেষণায় দেখা যায় যে মিডিয়াল টেম্পোরাল লোব (MTL) প্রাথমিকভাবে নিউরোডিজেনারেটিভ রোগ সনাক্ত করতে এবং পরে জ্ঞানীয় ফাংশন নির্ণয়ের জন্য বায়োমার্কার হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।

গবেষণার সীমাবদ্ধতা কি কি ছিল?

গবেষণায় অংশগ্রহণকারীরা আফ্রিকান আমেরিকান এবং বেশিরভাগই মহিলা ছিলেন বলে গবেষণাটি সমস্ত জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে সাধারণত প্রয়োগ নাও হতে পারে বলে অভিমত দিয়েছেন গবেষকরা। যদিও ব্যায়ামের কারণে বিএমআই এবং এ্যারোবিক ফিটনেসের মতো স্বাস্থ্যের শারীরিক ব্যবস্থায় তেমন কোনও উন্নতি গবেষণায় পাওয়া যায় নি, তারপরও কাঠামোগত এবং কার্যকরী জ্ঞানীয় সক্ষমতা খুঁজে পেয়েছিলেন গবেষকরা।

এতদসত্ত্বেও, এই গবেষণার ফলাফলগুলি এ্যারোবিক অনুশীলনের নিউরোপ্রোটেক্টিভ মানকে শক্তিশালী করে। গবেষকরা জোর দিয়ে বলেন যে পরবর্তী জীবনে যদি নিয়ম করে ব্যায়াম করা হয় তবে এটি জ্ঞানীয় অবক্ষয় হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

Resources